গল্প “জীবন যুদ্ধ” | লেখিকা উম্মে হাসনা নিপা।

0
87

রাকিব আজ আমাদের ১ম বিবাহ বার্ষিকী তুমি তা ভুলে গেলে?

এই বলে রিতু ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো।

রাকিব: কিছুই বলছেনা,বলতে গেলেই কথা এলোমেলো

হয়ে যাচ্ছে।

রিতু শুধুই কাঁদছে..

এই কাঁন্না আজ নতুন নয়।বিয়ের আগে ওদের সম্পর্ক ছিল

৭বছর, সে সময় ও রাকিব এর কোন বিশেষ দিন মনে

থাকতো না।কখনো রিতুর জন্মদিনে উইশ করেনি রাকিব।

ভুলে যেত সবসময়।

রিতু রাকিব কে ভালোবাসতে গিয়ে অনেক কিছুই

মানিয়ে নিয়েছে।

একবছর হল ওরা বাসার কাউকে না জানিয়ে বিয়ে

করেছে।

রাকিব এর চাকরী হলেই বাসায় প্রপোজাল দিবে এই

সিদ্ধান্ত ই নিয়েছিল।

তবে বিয়ের ১বছর হয়ে গেলেও কোন চাকরী মেলেনি

রাকিব এর।

বন্ধুদের সাথে শেয়ারে বিজনেস করতে দিয়ে মোটা

টাকা লোকসান এ পরে গেছে।

এরপর থেকেই বেশিরভাগ সময় নেশাগ্রস্ত থাকে।

রিতু প্রায় ই টাকা দিয়ে সাহায্য করলেও তা দিয়ে

রাকিব নেশা করে।

রিতু: তুমি আজ ও নেশা করেছো রাকিব?

আজ এই বিশেষ দিনেও নেশা করলে?

আমার কাছ থেকে টাকা নিলে চাকরীর দরখাস্ত করার

কথা বলে আর তুমি তা দিয়ে নেশা করলে?

রাকিব: চাকরীর দরখাস্ত করতে চেয়েছিলাম।

বাসা ভাড়া না দিলে আজ বাসা ছেড়ে দিতে হত তাই

দিলাম।

রিতু কল কেটে দিল..

আজকাল রিতু কেমন যেন বোঝা হয়ে গেছে।

আগে ছেড়ে যাবার কথা বললেই রাকিব অনেক কষ্ট পেত।

রিতুকে ছাড়া মরে যাবে এটাই বার বার বলতো কিন্তু এখন

পারলে নিজেই রিতুর জীবন থেকে নিজেই সরিয়ে নেয়।

মাথা যখন ব্যাথা হয় তখন মাথার মুকুট ও বোঝা মনে হয়

এটাও ঠিক তেমন।

এদিকে রিতুর মা-বাবা রিতুর জন্য পাত্র দেখছে।

আর রিতুও ধীরে ধীরে ভেঙে পরছে মানুষিক এবং

শারীরিক ভাবে।

চোখের নিচে কালী জমে গেছে।রাকিব এর পরিবর্তন

মেনে নিতে পারছেনা কোন ভাবেই।

অনেক ভালো ছাত্র ছিল একটা সময়।

রিতুর থেকে ২বছরের সিনিয়র।

বার বার বি.সি.এস এ অকৃতকার্য হওয়ায় নিজের প্রতি

কনফিডেন্স ই হারিয়ে ফেলেছে রাকিব।হতাশা এবং

বার বার ব্যর্থতাই রিতুর প্রতি অবহেলার কারন।

রিতু এতটাই দূর্বল হয়ে গেছিল রাকিবের প্রতি যে

রাকিব ছাড়া কিছুই কল্পনা করতে পারতোনা।

রিতু সবে অনার্স কমপ্লিট করেছে।

দু-একটা টিউশনি করিয়ে যা পায় তা রাকিব কে দেয়।

সম্পর্ক থাকা অবস্থায় টাকা নিতে রাজি হতনা রাকিব

কিন্তু বিয়ের পর না নিয়ে উপায় ও নেই।

মাঝে মাঝেই দু বেলা না খেয়ে থাকে সে।

রিতু প্রায় ই বন্ধুর বাসার নাম করে রাকিব কে গিয়ে

রান্না করে খাওয়ায়।

দুজন ই আশার উপর টিকে আছে যে দুজন ই বাকি সবার মতন

সংসার করবে।সুখে থাকবে।

টিউশন করাতে গিয়ে রিতু সেন্সলেস হয়ে যায়।

যখন সেন্স ফিরে তখন রিতুর স্টুডেন্ট এর বাসার বিছানার

উপর শুয়ে আছে।

আর স্টুডেন্ট মা হেসে হেসে বললো,কি রিতু বিয়ে করলে

আমাদের জানালেও না?

রিতু তার দিকে তাকিয়ে আছে।

আন্টি কি বলেন?

– আন্টি সব জেনে গেছে রিতু।বিয়ের মিষ্টি সাথে মা

হবার মিষ্টি যেন পাই

রিতু: আন্টি..

সেন্সলেস হয়ে গিয়েছিলে।তোমার কাকার বন্ধু ডাক্তার

সে এসে দেখে গেছে।তুমি প্রেগন্যান্ট তা তুমি জানতে?

রিতুর মুখ ফেকাসে হয়ে গেছে।

না আসলে হুম।

কি হ্যাঁ না করছো?

বরকে জানাও।

রিতু: আচ্ছা আন্টি আজ আসছি

>যেতে পারবে?

আরেকটু বিশ্রাম নিয়ে যাও।

রিতু:না ঠিক আছি আমি।

রিতু বাসা থেকে বের হয়েই রাকিবকে কল দিলো

ফোন বন্ধ পেয়ে রাকিব এর বাসায় গেল।

অনেক্ষন দরজা নক করতেই দরজা খুললো।

রিতু: এখনো ঘুমাও?

রাকিব: হুম…না

রিতু: ফোন বন্ধ কেন?

রাকিব: আসলে ফোনটা বিক্রি করে দিছি।টাকা পেতো

অনেকে।

রিতু রাকিব এর কলার ধরেই বললো,ওই ফোনটা আমি

কিনে দিয়েছিলাম তোকে।

ওই ফোন তুই কি করে বিক্রি করিস?

আমার জীবন তুই শেষ কেন করলি?আমি কি এমন শত্রুতা

করেছি তোর সাথে এই বলে কাঁদতে কাঁদতে রাকিব এর

পায়ের কাছে বসে পরলো…

রাকিব রিতুকে উঠিয়ে বিছানায় বসালো।

রাকিব: রিতু আমি কি করবো বলতে পারো?

আমার কষ্ট কোন নেশাতেও কমেনা আজ কাল।

বাবা অসুস্থ আমি কোন সাহায্য করতে পারছিনা।

রিতু: আর আমি অসহায় না?

আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে,কাল তারা আসবে আংটি

পরাতে আমি কি করবো?

রাকিব চুপ করে আছে।

রিতু: এতদিন বিয়ের কথা লুকিয়ে রাখতে পেরেছি কিন্তু

এখন কি করে লুকিয়ে রাখবো বেশিদিন যে আমি মা হতে

যাচ্ছি।

রাকিব রিতুর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। সব চেয়ে

খুশির খবর আজ শুনতে হতাশা বেড়ে যায়।

চোখ ঝাপ্সা হয়ে আসছে রাকিব এর সাথে সামনের

ভবিষ্যৎ।

রাকিব রিতু কোলে মাথা রেখে ধীর গলায় বলছে,রিতু এত

বড় উপহার আল্লাহ আমাদের দিলো কেন?আমরা কি তার

সম্মান রাখতে পারবো?

রিতু: আজ আমার জীবন কত সুন্দর হতে পারতো,আমি

অনেক ভালো থাকতে পারতাম।ভালো ভাবে সংসার

করতে পারতাম।

রাকিব:তুমি কি আমাকে বোঝা ভাবো? তাহলে বিয়েটা

করে নেও মা বাবার মতে।

রিতু রাকিবকে চড় দিল।

লজ্জা লাগেনা তোর, তুই অভিশাপ আমার জীবনে।এর

চেয়ে মরে গেলেও বাঁচতাম আমি।একদিন কান্নাকাটি

করে ভুলে যেতাম।

রাকিব রিতুর কানের কাছে ফিসফিস করে বলতে

লাগলো,রিতু নতুন একটা নেশার সন্ধান পেয়েছি যা

করলে সব কষ্ট দূর হয়ে যায়।

অভিশাপ সব আশীর্বাদ হয়ে যাবে।

রিতু: তুই নেশা নিয়েই থাক।এই বলে চলে গেল।

রাতে পেটের উপর হাত দিয়ে শুয়ে শুয়ে ভাবছে কাল

সকাল এ মাকে সব বলে দিবে রিতু।

মা সব জানলে আর বিয়ে দিবেনা।

পাগলটাকে কাল একটা ফোন কিনে দিব।

অনেক কিছু বলেছি ওকে কাল গিয়ে ক্ষমা চাইবো।

সব ঠিক হয়ে যাবে আমি জানি।

আমার বাচ্চা সব ঠিক করে দিবে এই ভাবতে ভাবতে

ঘুমিয়ে গেল।

ভোরের দিকে সজল(রাকিব এর বন্ধু) কল পেয়ে ঘুম ভাঙে

রিতুর।

চোখ খুলে দেখে সজল।এতো ভোরে তার কল।

রিতু: সজল ভাই।

সজল কাঁদছে..

রিতু: কি হয়েছে ভাই?

সজল: রিতু তুমি একটু রাকিব এর বাসায় আসতে পারো?

ও আর নেই রিতু।আমি এসে দেখি ও পাখার সাথে ঝুলছে।

তাড়াতাড়ি আসো নইলে লাশ পুলিশ নিয়ে যাবে।

এই বলে কাঁদতে লাগলো।

রিতুর সব দুঃস্বপ্ন লাগছে।

কিছুতেই এ হতে পারেনা।

আমার কথায় রাগ করে এতো বড় শাস্তি আমায় কিছুতেই

দিতে পারেনা।

ওয়াশরুমে গিয়ে কল ছেড়ে মুখে ওড়না গুঁজে কাঁদছে রিতু।

এ কাঁন্না যে অবৈধ কান্না।যে কান্না সবার আড়ালে

কাঁদতে হয়।

আমি কি করে রাকিব এর মৃত মুখ দেখবো…

ও মারা যেতে পারেন।

 

লেখিকাঃ উম্মে হাসনা নিপা।

অর্থনীতি বিভাগ, অনার্স ৩য় বর্ষ

বি এম কলেজ, বরিশাল।

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here